আছিয়া বেগমকে অপারেশন থিয়েটারে রেখে এসে পায়চারী করছেন আছগর আলী। তীব্র ঝড়ঝাপটার আক্রমণের ফলে ন্যুয়ে পড়া গাছটির মতো মলীন শতশত দুর্ভাবনার টর্নেডো আঘাত করছে তার ক্লান্ত মনে। মাথায় প্রচণ্ড দুলুনি অনুভব করছে। মাথাব্যথার তীব্রতার কাছে হার মেনে বসে পড়েছেন বারন্দায় থাকা মেডিকেল চেয়ারে। অথচ এখন তার বসে থাকার সময় না ;ডাক্তার বলেছে তিন ব্যাগ রক্ত প্রস্তুত রাখতে । কিন্তু এক ব্যাগ ও প্রস্তুত করতে পারেন নি তিনি । মেডিকেল ব্লাড ব্যাংকেও পাননি আছিয়া বেগমের দুর্লভ রক্ত। পাওয়ার সম্ভাবনাটিও সংকুচিত হয়ে আসছে ক্ষণেক্ষণে। মফস্বল থেকে উঠে আসা আছগর আলীর কাছে শহরকে বেশ ব্যস্ত মনে হচ্ছে ;শহরের মত ব্যস্ত তার আদিবাসী। দিকভ্রান্ত মুক্ত পাগলের মত সবাই ছুটছে তার প্রয়োজনে। এই ব্যস্ত মানুষের ভিরে তার পরিচিত কেউ নেই ;তাকেও কেউ চেনেনা। শহরের কোনো প্রান্তদেশেও যার পরিচিত কেউ নেই ;পথচারীদের কেউ তাকে চেনার কথা না। হচ্ছেও তাই এখানের প্রত্যেকটি ধূলীকণা, গাছ পাখিদের মধ্যেও শহুরে ব্যস্ততায় ছেয়ে গেছে । নব্য পরিচিত চেনাজানা এই বারান্দায় বসে আছিয়া আর নবাগত সন্তানকে নিয়ে ভাবতে ভাবতে তার চোখ ঝাপসা হয়ে উঠে। ঝাপসা চোখে তাকিয়ে দেখেন এগিয়ে আসছেন সাদা এপ্রোন পরিহিত একজন ডাক্তার । শুভসংবাদের পিপাসায় তাকে ডাক্তারের দিকে এগিয়ে নিতে বাধ্য করে। এপ্রোন পরিহিত ডাক্তারের দিকে এগিয়ে যান তিনি। এই মানুষটার কিছু কথাই দিতে পারে জীবন মরুতে দাঁড়িয়ে থাকা আছগর আলীর মনে শান্ত শীতল হাতের স্নেহের পরশ। কিম্বা, খরস্রোতার মতো ভাসিয়ে মতো নিতে পারে অনিশ্চয়তার ভবিষ্যতে। এই অনিশ্চয়তাই হয়তো ছিলো আছগর আলীর ভাগ্যে! ডাক্তারের সাথে দেখা হতেই তিনি বিষণ্ণ মুখে দুঃখের প্রলাপ এঁকে বলে উঠলেন ;'স্যরি জনাব, আপনার একটি ছেলে দুনিয়াতে এসেছিলো কিন্তু আমরা তাকে আটকাতে পারিনি। সে চলে গেছে চিরস্থায়ী জীবনের যাত্রী হয়...। এখন দুই ব্যাগ রক্ত দিন, আমরা আপনার স্ত্রীকে বাঁচানোর যথাসাধ্য চেষ্টা করবো ;বাকি সৃষ্টিকর্তার হাতে ছেড়ে দিন"।ডাক্তারের কথা শুনে অশ্রুসিক্ত চোখে রোবটেত মত দাঁড়িয়ে থাকেন আছগর আলী । চোখের কোণঘেঁষে ভেসে উঠে আছিয়া বেগমের হাস্যজ্জ্বল মুখ। এইত ক'দিন আগে হাল থেকে এসে দেখেন আছিয়া বেগম কথা বলছেন __
কীরে কিছু খাবি?
তোর লাইগা নতুন কাতা বানাচ্ছি! এই দ্যাখ তোর জামা কত্ত সুন্দর। আছগর আলী হাসছলেন। তিনিও অনাগত অতিথির জন্য স্বপ্নজাল বুনেছিলেন! কিন্তু আজ! চোখের সামনে সাজানো স্বপ্ন তলিয়ে যাওয়া দেখে চিৎকার করে উঠেন তিনি। আর বেড়িয়ে পড়েন অপরিচিত শহরে পরিচিত দুজন রক্তদাতার খোঁজে......... !
প্রিয় পাঠক! এমন অনেক আছগর আলীর গল্প আমাদের মুখস্ত ;যাদের স্বপ্নগুলো ধ্বংস হচ্ছে প্রতিনিয়ত । এই স্বপ্নভঙ্গের করাল গ্রাসে ডুকরে ডুকরে কাঁদছেন আজীবন। আমরা এরকম নিত্যনতুন গল্প শুধুই পাঠ করি ;কিন্তু তার থেকে সচেতন হইনা। রক্তের প্রয়োজন আমরা অনুভব করি কিন্তু স্পর্শ করিনা এর থেকে বাঁচার সফল কর্মসূচি। গ্রহণ করিনা সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ; যার ফলে অসুস্থ জীবন পাবে স্বাচ্ছন্দ্য সুস্থতা।
তাই আসুন,গ্রাম, গঞ্জ শহরে রক্তদানের উদ্যোগ গ্রহণ করি। মানুষকে সচেতন করি। যাতে, রক্তের অভাবে প্রাণনাশে পতিত না হয় আছিয়া আছগর আলীর মতো হাজারো পরিবার।
No comments